মাস্টার ট্যাকটিশিয়ানদের খুঁটিনাটি: যাদের দারুণ উদ্ভাবনী কৌশল আধুনিক ফুটবলকে এক অনন্যমাত্রায় নিয়ে গিয়েছে

Image
ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে শারীরিক দক্ষতার পাশাপাশি কৌশলগত পরিশীলনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ মানুষের কাছে জনপ্রিয় এই খেলায় বছরের পর বছর ধরে উল্লেখযোগ্য বিবর্তন হয়েছে। এই বিবর্তনটি আসলে কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং উদ্ভাবনের ক্রমাগত পরিবর্তনের জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। এই বিষয়ে, আমরা কিছু আইকনিক ফুটবল মাস্টার ট্যাকটিশিয়ানদের কৌশল কাটাছেঁড়া করলেই বুঝতে পারি যে তাদের দারুণ উদ্ভাবনী কৌশলগুলো আধুনিক ফুটবলকে উল্লেখযোগ্যভাবে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছে। তো সমগ্র ফুটবল সমর্থকদের সাথে নিয়েই তাদের ফুটবল দর্শন এবং আকর্ষনীয় বিবর্তন একটু আলোকপাত করে দেখা যাক- রাইনাস মিশেল এবং টোটাল ফুটবলের আগমন- নেদারল্যান্ডস থেকে উঠে আসা রাইনাস মিশেল 'টোটাল ফুটবল' প্রবর্তনের মাধ্যমে ফুটবল কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। এই সিস্টেমে সাধারণত খেলোয়াড়েরা ফ্লুইডলি তাদের পজিশন স্যুইচ করে থাকে, যার ফলে বল দখলে থাকাকালীন মাঠের জায়গাগুলো কিছুটা প্রসারিত হয় এবং ডিফেন্স করার সময় জায়গাগুলো আবার সংকুচিত হয়ে যায়।এটি স্পষ্ট যে মিশেলের ফ্লেক্সিবল এবং পজিশনলেস খেলার দর্শন ফুটবলে বিপ্লব ঘটিয়েছিল যা ...

FC Barcelona The Beginning of a New Era

 

La Liga Champion 2022-23


ক্যাম্প ন্যুতে আজ এই সিজনে শেষবারের মতো খেলতে যাচ্ছে বার্সেলোনা।

এর আগেই আসলে জাভি হার্নান্দেজের অধীনে প্রথম লীগ শিরোপা ঘরে তুলে নেয় এফসি বার্সেলোনা। জিতে নেয় তাদের ২৭তম লা লিগা। অনেক চড়াই উতরাই পার করতে হয়েছে বার্সেলোনাকে এই শিরোপা জেতার জন্য। সর্বশেষ লীগ শিরোপা এসেছিল ৪ বছর আগে যখন কোচ ছিলেন ভালভার্দে আর দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন লিওনেল মেসি, সেটি ছিল ১১ বছরের মধ্যে বার্সেলোনার ৮ম লীগ জয়। সেবার লীগ জিতেও যেন একেবারেই সন্তুষ্ট ছিলেন না বার্সেলোনার ফ্যানরা। কারণটা ছিল কোপা দেল রের ফাইনাল আর উচল সেমিফাইনালে বাজেভাবে হার। ট্রেবলের খুব কাছে যেয়েও যখন শুধু লীগ নিয়েই চুপচাপ থাকতে হয়, তখন মোটামুটিভাবে সব বার্সেলোনা ফ্যানেরই মন খারাপ ছিল। ঠিক তখনই লিওনেল মেসি বলেছিলেন যে আমরা লা লিগা কে মূল্যায়ন করছি না। ১১ বছরে ৮টা লীগ জেতা কতটা কঠিন সেটা আমরা সামনে বুঝতে পারবো। 
 
এরপরের সিজনে লা লিগা জেতা হয় নি বার্সেলোনার। মেসিকে ক্লাব ছাড়তে হয়েছে। মেসিকে ছাড়া ক্লাবের পারফরম্যান্স ছিল একেবারে অসহায়। লা লিগাতে ৯ম থাকা অবস্থায় যখন কোচ রোনাল্ড কোম্যান স্যাক হন, তখন ম্যানেজার হয়ে আসেন ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং সফল মিডফিল্ডার জাভি হার্নান্দেজ। সেখান থেকে জাভি দলকে টেনে তুললেন লীগের ২য় অবস্থানে। সেই সিজনে বার্সেলোনার আর কোন ট্রফি জেতা হয় নি। এরপর ট্রান্সফার উইন্ডোতে প্লেয়ার কেনা, প্লেয়ার রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে কিনা এই নিয়ে অনেক ঝামেলার পর বলা যায় মোটামুটিভাবে একটা সফল ট্রান্সফার উইন্ডো অয়ার করে সিজন শুরু করে বার্সেলোনার। অনেকের মতেই মেসিকে ছাড়া বার্সেলোনা লীগ জেতা তো দূরে থাক টপ ফোরেও থাকবে কিনা সন্দেহ। সেখানে শুরু থেকেই লা লিগা শিরোপার দৌড়ে ছিল জাভির বার্সেলোনা। কিন্তু মাঝে বাধা দেয় ইঞ্জুরি, দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার আরাউহোর আর ক্রিস্টেন্সেন, কুন্দে এদের ইঞ্জুরিতে ভুগতে হয় বার্সেলোনাকে। আবারও বাদ পরতে হয় উচল গ্রুপ স্টেজ থেকে। এরপর আসে বিশ্বকাপের ব্রেক। প্রায় দেড় মাস পর আবার ক্লাব ফুটবল শুরু হলে ফুল ফিট স্কোয়াড নিয়ে একের পর এক ম্যাচ জিততে থাকে জাভির বার্সেলোনা। স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে একদম একপেশে খেলা খেলে জিতে নেয় এই সিজনের প্রথম শিরোপা। খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত জাভির বার্সেলোনার সেরা ম্যাচ। কিন্তু এরপর ফেব্রুয়ারী আসতেই আবারও দেখা দেখা ইঞ্জুরি বাধা। এবার পেড্রি আর দেম্বেলে ইঞ্জুরড হয়। ম্যানেজার জাভির সিস্টেমে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ফুটবলার ছিলেন এই দুইজন। এদের অনুপস্থিতিতে বিদায় নিতে হয় ইউরোপা লীগ আর কোপা দেল রে থেকে। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড আর রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এমন পরাজয়ের পর জাভিকে স্যাক করা উচিত বলে অনেকেই মনে করা শুরু করেন। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এতো ঝামেলার মধ্যেও কিন্তু জাভির বার্সেলোনা লীগের শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছিল। এমনকি রিয়াল মাদ্রিদ আস্তে আস্তে পয়েন্ট ড্রপ করায় বার্সেলোনার সাথে তাদের পয়েন্টের ব্যাবধান আরও বারতে থাকে। লা লিগা এল ক্লাসিকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও জয় তুলে নেয় জাভির বার্সেলোনা। তারপরেও যেন অনেকের মনে হচ্ছিল যে শেষমেশ লীগটা মাদ্রিদ জিতেও যেতে পারে। তবে সেটা আর হয় নি। কারণ প্লেয়ার ইঞ্জুরিতে পরার পরেও অনেক ম্যাচই ১-০ গোলে জিতে নেয় বার্সেলোনা। এর কৃতিত্ব অবশ্যই ডিফেন্স লাইনের। মূলত আরাউহো আর গোলকিপার টার স্টেগেনের। ডিফেন্সিভ পারফরম্যান্স আর ক্লিন শিটে নিজেদের ইতিহাসের সেরা পারফর্ম্যান্সের রেকর্ড এবার ভেঙে দেয় এবার। সামনে সুযোগ লা লিগার ইতিহাসের সের ডিফেন্সিভ পারফরম্যান্স আর ক্লিন শিটের রেকর্ড নিজের করে নেওয়া। জাভির কাছে থেকে সেই চিরাচরিত টিকিটাকা ফুটবল হয়তো অনেক ম্যাচেই দেখা যায় নি। তবে দলের মিডফিল্ড আর অ্যাটাকের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় না থাকার পরেও কিভাবে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে ম্যাচ বের করে নিতে হয় ডিফেন্সিভ মাস্টারক্লাস দিয়ে সেটা দেখিয়েছেন ম্যানেজার জাভি। এরপর ৩৪ তম ম্যাচডেতে এসে লীগের ৪ ম্যাচ বাকি থাকতেই নগর প্রতিদন্দি এস্পানিয়লের মাঠে জয় তুলে নিজেদের ২৭ তম লা লিগা শিরোপা নিশ্চিত করে বারসেলোনা।
 
এবারের লীগ শিরোপাতে দল হিসেবে কম বেশি সবাই পারফর্ম করেছে। লা লিগার টপ স্কোরার হবার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন লেভানডোস্কি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সে একমাত্র গোল করেন। এরকম আরেকজন হলেন পেড্রি। মিডফিল্ডার হলেও এবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করে ৩ পয়েন্ট এনে দিয়েছেন ২০ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। বার্সেলোনার হয়ে এবার সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছে ১৮ বছরের গাভি। ইঞ্জুরির আগে পর্যন্ত উইংয়ে একের পর এক তান্ডব চালিয়েছেন দেম্বেলে। তার ইঞ্জুরিতে গোল অ্যাসিস্ট করে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন রাফিনহা। মিডফিল্ডে বুস্কেটস আর ফ্রেংকির পারফরম্যান্সকেও ছোট করে দেখার কিছু নেই। বার্সেলোনার হয়ে শেষ সিজনে এই লীগ শিরোপা অবশ্যই ক্যাপ্টেন বুস্কেটসের প্রাপ্য। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে গোলকিপার টার স্টেগেন আর ডিফেন্ডাররা।

আরাউহোকে মনে করা হচ্ছে ভবিষ্যৎ ক্যাপ্টেন। আর টার স্টেগেন তার পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণ করেছেন এভাবেও ফিরে আসা যায়। তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে এবার সবচেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে আলেহান্দ্রো বালদে কে। নিসন্দেহে জর্ডি আলবার উপযুক্ত রিপ্লেস্মেন্ট বার্সেলোনা পেয়েই গিয়েছে বলা যায়। এই সিজনের লা লিগার সেরা লেফট ব্যাক তাই বালদে কেই বলতে হয়। এমনকি তার সম্ভাবনা আছে এভারের গোল্ডেন বয় জেতার যেটা গত দুই বছর জিতেছে পেড্রি আর গাভি। এই লীগ শিরোপা খুবই প্রয়োজন ছিল বার্সেলোনার নতুন প্রজন্মের জন্য। তাদের হাত ধরেই বার্সেলোনা পেতে পারে আরেকটি সোনালী অধ্যায়।

এজন্যই বলা হচ্ছে "The Beginning of a New Era."

Comments

Popular posts from this blog

লিওনেল মেসি- দ্য ম্যাজিকম্যান

জিয়ানলুকা প্রেসটিয়ান্নি: দ্য নিউ উইং সেনসেশন অফ আর্জেন্টিনা

পাউ কুবার্সি- দ্য রোলস রয়েস কাতালান