মাস্টার ট্যাকটিশিয়ানদের খুঁটিনাটি: যাদের দারুণ উদ্ভাবনী কৌশল আধুনিক ফুটবলকে এক অনন্যমাত্রায় নিয়ে গিয়েছে

Image
ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে শারীরিক দক্ষতার পাশাপাশি কৌশলগত পরিশীলনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ মানুষের কাছে জনপ্রিয় এই খেলায় বছরের পর বছর ধরে উল্লেখযোগ্য বিবর্তন হয়েছে। এই বিবর্তনটি আসলে কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং উদ্ভাবনের ক্রমাগত পরিবর্তনের জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। এই বিষয়ে, আমরা কিছু আইকনিক ফুটবল মাস্টার ট্যাকটিশিয়ানদের কৌশল কাটাছেঁড়া করলেই বুঝতে পারি যে তাদের দারুণ উদ্ভাবনী কৌশলগুলো আধুনিক ফুটবলকে উল্লেখযোগ্যভাবে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছে। তো সমগ্র ফুটবল সমর্থকদের সাথে নিয়েই তাদের ফুটবল দর্শন এবং আকর্ষনীয় বিবর্তন একটু আলোকপাত করে দেখা যাক- রাইনাস মিশেল এবং টোটাল ফুটবলের আগমন- নেদারল্যান্ডস থেকে উঠে আসা রাইনাস মিশেল 'টোটাল ফুটবল' প্রবর্তনের মাধ্যমে ফুটবল কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। এই সিস্টেমে সাধারণত খেলোয়াড়েরা ফ্লুইডলি তাদের পজিশন স্যুইচ করে থাকে, যার ফলে বল দখলে থাকাকালীন মাঠের জায়গাগুলো কিছুটা প্রসারিত হয় এবং ডিফেন্স করার সময় জায়গাগুলো আবার সংকুচিত হয়ে যায়।এটি স্পষ্ট যে মিশেলের ফ্লেক্সিবল এবং পজিশনলেস খেলার দর্শন ফুটবলে বিপ্লব ঘটিয়েছিল যা ...

“English Pep League” the Guardiola Era


 ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে হ্যাট্রিক শিরোপা ঘরে তুললো ম্যানচেস্টার সিটি। এই নিয়ে শেষ ছয় বছরে ম্যানেজার পেপ গার্দিওলার অধীনে পাঁচবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন হলো সিটিজেনরা। পেপ গার্দিওলা প্রথম ম্যানেজার হিসেবে তিনটি ভিন্ন লীগে হ্যাট্রিক শিরোপা জয়ের রেকর্ড করলেন। এর আগে বার্সেলোনার হয়ে ২০০৯,১০,১১ সালে লা লিগা এবং বায়ার্নের হয়ে ২০১৪,১৫,১৬ সালে বুন্দেসলিগা জয় করেন পেপ গার্দিওলা। 

পেপ গার্দিওলা যখন ম্যানচেস্টার সিটির ম্যানেজার হয়ে আসেন তখন অনেকেই ধারণা করেছিল আগের দুই ক্লাবের মতো এতো সহজে ইপিএল এ সফলতা পাবে না তিনি। তার প্রথম সিজনে যখন চেলসি শিরোপা জিতে তখন ম্যানচেস্টার সিটির অবস্থান ছিল তৃতীয়। প্রথম সিজনে অনেক সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল পেপ গার্দিওলাকে। অনেকের ধারণা ছিল তার চিরাচরিত পজেশনাল ফুটবল বা টিকিটাকা এই প্রিমিয়ার লীগে কাজ করবে না। কিন্তু ম্যানেজার হয়ে তার দ্বিতীয় সিজনেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসে একমাত্র ক্লাব হিসেবে ১০০ পয়েন্ট নিয়ে শিরোপা জিতে নেয় ম্যানচেস্টার সিটি। সেই সিজনে ১০০ পয়েন্টের পাশাপাশি ১০০ গোলও করে ম্যানচেস্টার সিটি এবং লীগ জিতে নেয় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চেয়ে ১৯ পয়েন্ট বেশি নিয়ে। এরপরের সিজনে আবারও লীগ জিতে নেয় ৯৮ পয়েন্ট পেয়ে৷ অসাধারণ পারফর্ম করে ৯৭ পয়েন্ট পেয়েও লীগ জিততে পারে নি লিভারপুল৷ কারণ ম্যানচেস্টার সিটির পারফরম্যান্স ছিল আরও চমৎকার । কেভিন ডি ব্রুইনার ইনজুরির মাঝেও সিটি এক নাগারে পারফর্ম করে গিয়েছিল লীগে। দুই সিজনে ম্যানচেস্টার সিটি লীগ শিরোপা জিতে ১৯৮ পয়েন্ট পেয়ে। এরপর যদিও ২০২০ সালে ইপিএল জিততে পারে নি পেপ গার্দিওলার শিষ্যরা। 

এরপর শুরু হয় পেপ গার্দিওলার হ্যাট্রিক শিরোপার প্রথম সিজন। উচলে সফলতা না পেলেও লীগে কোন রকম ছাড় দেয়নি ম্যানচেস্টার সিটি। ২০২১ সালে আবারও লীগ জিতে নেয় ম্যানচেস্টার সিটি। সেবার সিজনের মাঝামাঝি অবস্থায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বেশ ভালো পারর্ফম করলেও ফর্ম ধরে রাখতে পারে নি শেষ পর্যন্ত। তাই সহজেই ১৪ পয়েন্টের ব্যাবধানে লীগ শিরোপা ঘরে তোলে ম্যানচেস্টার সিটি। ২০২২ এ আবারও সিটির সামনে খুব কড়া প্রতিদ্বন্দিতা দেখায় লিভারপুল। এবারও ইপিএল এর শিরোপা কার হাতে উঠতে যাচ্ছে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় শেষ লীগ ম্যাচ পর্যন্ত। অ্যাস্টন ভিলার সাথে পিছিয়ে পরেও সাব হিসেবে নামা গুন্ডোগানের জোড়া গোলে ম্যাচের পাশাপাশি শিরোপা জিতে নেয় পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি। তবে গত দুই সিজনেই ইনজুরির সমস্যার কারণে এক কথায় কোনো প্রপার স্ট্রাইকার ছাড়াই খেলতে হয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটিকে। এবার সিজন শুরুর আগেই তাই তারা দলে ভিড়িয়েছে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সেরা গোল স্কোরার আর্লিং হালান্ডকে। সাথে আরও যোগ দেয় আর্জেন্টাইন তারকা জুলিয়ান আলভারেজ, যে কিনা রিভার প্লেটের হয়ে সম্ভাব্য সব ট্রফি জিতে এসেছে। রিভার প্লেটের হয়ে আলভারেজ গত সিজনে এক ম্যাচে ছয় গোলও করেন। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয়টা ঘটে সিটিতে পেপ গার্দিওলার সহকারী হিসেবে থাকা আর্তেতা। তিনি এখন বর্তমানে আর্সেনালের ম্যানেজার। সে সিটি থেকে কিনে নেয় জিনচেনকো আর গাব্রিয়েল জেসুসের মতো প্লেয়ার, যারা শুরু থেকেই পারফর্ম করতে থাকে। শুরু থেকেই পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকে আর্সেনাল। বিগ ম্যাচে বড় জয়ের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত একের পর এক হালান্ডের গোল স্কোরিং রেকর্ডের মাঝেও প্রায়ই হোচট খেতে হয় সিটিকে। পয়েন্টের ব্যাবধানও বাড়তে থাকে আর্সেনালের সাথে। একসময় দুই দলের  মাঝে ৮ পয়েন্টের ব্যাবধান হয়ে দাঁড়ায় এবং তখন সবাই ধরে নিচ্ছিল যে এবার আর্সেনালের  ঘরেই শিরোপা যাচ্ছে। কিন্তু মার্চ মাস পার হতেই একেবারে অদম্য হয়ে ওঠে সিটি। ওদিকে একের পর একেক ম্যাচে পয়েন্ট হারাতে শুরু করে আর্সেনাল। ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে টটেনহ্যামের বিপক্ষে হারের পর আর হারের মুখ দেখতে হয় নি ম্যানচেস্টার সিটিকে৷ মূলত এখানেই আবারও লীগ শিরোপা নিজেদের করে নেয় সিটি। শেষমেশ তিন ম্যাচ বাকি থাকতেই লীগ শিরোপা নিশ্চিত করেন সিটি। 

পেপ গার্দিওলা যখন ম্যানচেস্টার সিটিতে আসে তখন ব্রিটিশ মিডিয়া ধারণা করে যে তার ট্যাকটিক্স ইপিএল এ কাজ করবে না। প্রথম সিজনে ৩য় হবার পর অনেক ট্রলের শিকার হতে হয়। তবে সময়ের সাথে সাথে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগকে বলা যায় একেবারে এক ঘোড়ার দৌড়ে পরিণত করে ফেলেছেন পেপ। সিরি আ এবং বুন্দেসলিগাতে জুভেন্টাস আর বায়ার্নের একটানা লীগ জয় নিয়ে যখন মিডিয়া তাদের লীগের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে প্রশ্ন করতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় ইপিএল এ এসে ছয় সিজনের মধ্যে পাঁচটি লীগ শিরোপা জিতে নিলেন সিটির ম্যানেজার পেপ গার্দিওলা । খেলিয়েছেন পজেশনাল ফুটবল, খেলিয়েছেন কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবল এবং শেষ দুই সিজনে দেখা যাচ্ছে ফ্লুইড ফুটবল। বিশ্বকাপের পর থেকে ৩-২-৪-১ ফরমেশন খেলিয়ে জিতে নিলেন লীগ শিরোপা। পেপ গার্দিওলার ট্যাকটিক্সের সাথে পাল্লা দিতে এখন লীগের অন্যান্য দলকেও দেখা যাচ্ছে কখনও পজেশনাল ফুটবল বা কখনো বিল্ডিং ফ্রম দ্যা ব্যাক খেলানোর চেষ্টা করতে। এই সিজনে নতুন আসা ব্রাইটনের মাস্টার ট্যাক্টিশিয়ান ডি জার্বিও জানিয়েছেন পেপ গার্দিওলাকেই আদর্শ মনে করেন তিনি। পেপকে ম্যানেজার হিসেবে আদর্শ মনে করে আরও অনেকে তরুণ ম্যানেজারই দেখেছেন সফলতা। পেপ গার্দিওলার সিটির আগে সর্বশেষ হ্যাট্রিক ইপিএল জিতেছিল স্যার আলেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, যাদেরকে ইপিএল এর ইতিহাসের তো বটেই এমনকি ফুটবলের ইতিহাসেরও অন্যতম সেরা দল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে লীগের পয়েন্ট টেবিল দেখলে আপনি অবশ্যই দেখবেন যে স্যার আলেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চেয়ে পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি অনেক এগিয়ে। তবে সেসব তুলনায় আজ আর যাব না। 

পেপ গার্দিওলা নিসন্দেহে ফুটবলের ইতিহাসের সেরা ম্যানেজারদের একজন। তার ট্যাক্টিকাল গেমপ্লে আর আধুনিক ফুটবলের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াকে অবশ্যই যুগান্তকারী দিক হিসেবে ধরতে হবে। ম্যানেজার হিসেবে ১৫ বছরের মধ্যে অ্যাক্টিভ ছিলেন ১৪ বছর, যার মধ্যে ১১বারই জিতেছেন লীগ শিরোপা। যেখানেই যাক না কেনো লীগ শিরোপাকে যেন হাতের মোয়া বানিয়ে ছেড়েছেন এই মাস্টারমাইন্ড ম্যানেজার। অনেক লম্বা সময় সিটিতে থাকলে হয়তো তাদের ইতিহাসকেও অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাবেন পেপ গার্দিওলা । এখন শুধু দেখার অপেক্ষা কতদূর যেতে পারেন আধুনিক ফুটবলের এই মাস্টার ট্যাকটিশিয়ান।

লিখেছেন- Aqib Adnan

Comments

Popular posts from this blog

লিওনেল মেসি- দ্য ম্যাজিকম্যান

জিয়ানলুকা প্রেসটিয়ান্নি: দ্য নিউ উইং সেনসেশন অফ আর্জেন্টিনা

পাউ কুবার্সি- দ্য রোলস রয়েস কাতালান